রবিবার ২৫ জানুয়ারী ২০২৬ - ১০:৩৩
ঐক্য রক্ষা মানে আকিদা-বিশ্বাস থেকে পশ্চাদপসরণ নয়

ইরানের হাওজায়ে ইলমিয়ার প্রধান আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেছেন যে আফগানিস্তানের এই অঞ্চল ও মুসলিম বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও ভূমিকা রয়েছে এবং তা আরও সুদৃঢ় হতে পারে। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের মেধা, সামর্থ্য ও সম্ভাবনার ব্যাপক ক্ষেত্র রয়েছে এবং ইরান-আফগানিস্তানের সর্বোত্তম ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর তিনি সবসময় জোর দিয়েছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ আলী রেজা আ’রাফি আজ ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে হাওজায়ে ইলমিয়ার পরিচালকের কার্যালয়ে আফগানিস্তানের হাওজা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একদল আলেম ও শিক্ষকের সাথে সাক্ষাতকালে বলেন, আফগানিস্তানের আলেম, মাদ্রাসা ও শিক্ষাকেন্দ্র—বিশেষ করে কাবুলের “মারকাজে ফিকহি আইম্মে আতহার”-এর মূল্যবান সেবা প্রশংসনীয় ও ধন্যবাদের দাবিদার।

ইরানের হাওজাসমূহের পরিচালক কাবুলের ফিকহি মারকাজের দায়িত্বশীল ও শিক্ষকবৃন্দের ঐশী জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারে অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমরা আপনাদের সেই সব প্রিয়জনের সেবা ও পরিশ্রমের জন্য কৃতজ্ঞ, যারা জ্ঞান ও বিচারের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছেন এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির পতাকা উড্ডীন রেখেছেন। আমরা মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা ফাজেল লাঙ্কারানীর (রহ.) উচ্চ মর্যাদা কামনা করি।

শাবান মাস: আল্লাহর মেহমানিতে প্রস্তুতি ও রমজানে প্রবেশের উপযুক্ত সময়
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি শাবান মাসের তাৎপর্যের ওপর আলোকপাত করে বলেন, এ পবিত্র মাসে প্রদত্ত নির্দেশনাবলির দুটি দিক রয়েছে: একটি বিষয়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি—যা এ মাসের বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি ও সুযোগের কারণে গৃহীত; অপরটি পদ্ধতিগত ও প্রস্তুতিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি—যা মানুষকে আল্লাহর মেহমানিতে উপস্থিত হতে ও পবিত্র রমজান মাসে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করে।

তিনি এ মাসের শিক্ষায় ‘সালাওয়াতে শাবানিয়া’ ও ‘মুনাজাতে শাবানিয়া’-এর বিশেষ গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে এ দু’টি দোয়াকে শাবানের আধ্যাত্মিক পরিবেশে মানুষের পক্ষে উড্ডয়নের দু’টি স্তম্ভ ও ডানা আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ইমাম খোমেনী (রহ.) এ মুনাজাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। বস্তুত, মুনাজাতে শাবানিয়া হল আল্লাহকে চেনা ও তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পদ্ধতির একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ।

তিনি আরও যোগ করেন, চল্লিশেরও বেশি আল্লাহর নামের মাধ্যমে মুনাজাতে শাবানিয়া মানুষকে ধাপে ধাপে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া ও তাঁর অনুগ্রহ লাভের দিকে পরিচালিত করে।

মুনাজাতে শাবানিয়া: আধ্যাত্মিক যাত্রার এক শিক্ষালয়
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি মুনাজাতে শাবানিয়ার আধ্যাত্মিক দিক ব্যাখ্যা করে এ দোয়াটিকে আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর দরবারে বন্দেগি অর্জনের এক মহান পাঠ ও বিশাল শিক্ষালয় বলে বর্ণনা করেন। তিনি এ মুনাজাতের সালাত দিয়ে শুরু হওয়া ও এর প্রাথমিক অংশের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এ দোয়ায় বান্দা আল্লাহকে এভাবে ডাকে:

 وَ اسْمَعْ دُعائِی إِذا دَعَوْتُکَ، وَاسْمَعْ نِدائِی إِذا نادَیْتُکَ

“হে আল্লাহ! আমার দোয়া শুনুন যখন আমি আপনাকে ডাকি এবং আমার আহ্বান শুনুন যখন আমি আপনাকে স্মরণ করি।”

ইরানের দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রসমূহের পরিচালক আরও বলেন, পরবর্তী অংশে বান্দা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে:

وَ أَقْبِلْ عَلَیَّ إِذا ناجَیْتُکَ، فَقَدْ هَرَبْتُ إِلَیْکَ، وَ وَقَفْتُ بَیْنَ یَدَیْکَ مُسْتَکِیناً لَکَ، مُتَضَرِّعاً إِلَیْکَ

“আমার প্রতি মুখ ফেরান যখন আমি আপনার সাথে অন্তরঙ্গ আলাপ করি। নিশ্চয়ই আমি (দুনিয়াবী খায়েস থেকে) আপনার দিকেই পালিয়েছি এবং বিনয়-নম্রভাবে আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি।”

গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফিকহ শাস্ত্রের সদস্য বলেন, এ দু’টি অবস্থা বান্দার বিভিন্ন মানসিকতার প্রতিফলন: কখনো মানুষ নিজেকে দূরে, কখনো কাছে অনুভব করে। মুনাজাতে শাবানিয়ায় মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা এ দু’টি বিন্দু থেকেই শুরু হয়। এ পথে মানুষ আল্লাহর নামসমূহ পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগোয় এবং নিজেকে পুনরাবিষ্কার করে, এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে ‘দূর থেকে আহ্বান’-এর স্থলে ‘নিকট থেকে সাড়া’ লাভ করে।

তিনি মুনাজাতে এ আধ্যাত্মিক যাত্রার পরিপক্কতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দোয়ার শুরুতে আমরা বলি: “আপনি জানেন আমার অন্তরে কী রয়েছে, আপনি আমার প্রয়োজন সম্পর্কে অবগত, আপনি আমার গোপন বিষয় জ্ঞাত, আর আমার গন্তব্য ও অবস্থান আপনার কাছে গোপন নয়।” বান্দা স্বীকার করে: “হে আল্লাহ! আমার অন্তরের গুপ্ত বিষয় আপনি জানেন, আমার প্রয়োজনের খবর রাখেন, আমার গোপন ভাবনা আপনি জানেন। আমার পরিণতি ও চিরস্থায়ী আবাস সম্পর্কে কিছুই আপনার অজানা নয়।”

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি মুনাজাতে এ নৈকট্যের চরম অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, এ বন্দেগির পথ এতদূর এগোয় যে মানুষ এমন এক স্তরে উপনীত হয় যেখানে সব পর্দা সরে যায় এবং একটি দ্বিমুখী ও গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, যেমন দোয়ায় বলা হয়েছে: “যে পর্যন্ত হৃদয়ের দৃষ্টিসমূহ নুরের পর্দাগুলো ভেদ করে।” মুনাজাতে শাবানিয়ায় নৈকট্য ও সম্পর্কের পথের এটি এক জীবন্ত চিত্র।

মুনাজাতে শাবানিয়ায় তাওহিদ ও সালাওয়াতে শাবানিয়ায় বেলায়েত
সুপ্রিম হাওজা কাউন্সিলের সদস্য শাবান মাসের দোয়াগুলোর বিশেষ মর্যাদার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মুনাজাতে শাবানিয়ায় খাঁটি তাওহিদ ও আল্লাহর নৈকট্য—যা নিঃস্বার্থ বন্দেগির ছবি এঁকেছে—তারই পরিপূরক ‘সালাওয়াতে শাবানিয়া’; একটি দোয়া যাতে রিসালাত ও বেলায়েতের মর্যাদাসমূহ সুষ্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে।

তিনি এ দু’টি আধ্যাত্মিক উৎসের দিক ব্যাখ্যা করে বলেন, সালাওয়াতে শাবানিয়াতে ‘নবুওয়াতের বৃক্ষ’, ‘রিসালাতের খনি’ ইত্যাদি উচ্চাঙ্গের অভিব্যক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যা এ দোয়ায় বেলায়েত ও রিসালাতের অবস্থানকে ফুটিয়ে তোলে। বস্তুত, মুনাজাতে শাবানিয়ায় তাওহিদ ও আল্লাহর দিকে যাত্রার দর্পণ, এবং সালাওয়াতে শাবানিয়ায় রিসালাত ও বেলায়েত—এ দু’টিই আমাদের হাওজার প্রধান ও মৌলিক ভাণ্ডার।

হাওজাসমূহের পরিচালক বলেন, এ সূক্ষ্মতা ও গভীর আধ্যাত্মিকতা আহলে বাইত (আ.)-এর মাজহাবের অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং আমাদের হাওজার অস্তিত্বের মূল উপাদানও এ বৈশিষ্ট্যগুলোতেই নিহিত।

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি হাওজাসমূহের দায়িত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা আশা করি আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ আধ্যাত্মিক পরিবেশ থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের কর্তব্য হলো, আমরা নিজেরা এ জ্ঞান ও মহামূল্যবোধ থেকে উপকৃত হব এবং অন্যদেরকেও এ দিকে আহ্বান করব।

গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফিকহ শাস্ত্রের সদস্য জোর দিয়ে বলেন, একদিকে এ খাঁটি সত্য উপলব্ধি এবং অন্যদিকে অন্যদের সহায়তা করে তাদেরকে এ জ্ঞানের দিকে পরিচালিত করা—এটিই আমাদের ও আপনাদের উপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব, এবং আমাদের প্রকৃত পরিচয় এ দায়িত্ব পালনের মধ্যেই নিহিত।

মুসলিম বিশ্বে আফগানিস্তানের কৌশলগত অবস্থান
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, আফগানিস্তানের এই অঞ্চল ও মুসলিম বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও ভূমিকা রয়েছে এবং তা আরও সুদৃঢ় হতে পারে। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের মেধা, সামর্থ্য ও সম্ভাবনার ব্যাপক ক্ষেত্র রয়েছে এবং ইরান-আফগানিস্তানের সর্বোত্তম ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর তিনি সবসময় জোর দিয়েছেন।

তিনি যোগ করেন, বহুবার এ সম্পর্ককে গভীর করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে ইরান ও আফগানিস্তানের দুই জাতির মধ্যে ইসলামী, ঈমানী ও ঐশী-ইসলামী ভ্রাতৃত্বের নীতিগুলো প্রতিষ্ঠিত থাকে।

হাওজাসমূহের পরিচালক বলেন, আফগানিস্তানের শিক্ষক ও আলেমবৃন্দ বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন শাখা ও বিভিন্ন স্তরে সক্রিয়তার সাথে উপস্থিত রয়েছেন এবং আমি সবসময় এ ওপর জোর দিয়েছি যে শক্তিশালী ও গভীর সম্পর্ক বজায় থাকুক।

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কঠিন পরিস্থিতিকে সুযোগে পরিণত করা দুরূহ কাজ, কিন্তু মহান মানুষের কৃতিত্বই হলো সংকট ও দুঃসময়েও নিজেদের লক্ষ্য অর্জন ও দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখা; এটিই বিশেষ দক্ষতা।

ইসলামের নারী আদর্শ
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি ইসলামের তিন মহিয়সী নারীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বলেন, হযরত খাদিজা (সা.আ.), হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) ও হযরত যয়নাব (সা.আ.)-এর মধ্যে একটি সাধারণ উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, ইতিহাসের সংকটময় ও পরিবর্তনমুখী মোড়ে তাদের অটল অবস্থান।

তিনি বলেন, এঁরা প্রত্যেকেই অন্ধকার ও অতি কঠিন পরিস্থিতিতে, যখন আশাগুলো নিরাশায় রূপ নিচ্ছিল, তখনই হিদায়াতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। হযরত খাদিজা (সা.আ.) সে সময়ে, যখন রাসূল (সা.)-কে কেউ সাহায্য করছিল না, তখনই তাঁকে চিনেছিলেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর, যখন আহলে বাইত (আ.)-এর জন্য পরিস্থিতি সংকুচিত হচ্ছিল, তখন একাকী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আর হযরত যয়নাব (সা.আ.) আশুরার পর ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর পাশে একমাত্র অবিচল সহযাত্রী ছিলেন।

সুপ্রিম হাওজা কাউন্সিলের সদস্য জোর দিয়ে বলেন, এঁদের মহত্ত্ব এ কঠিন পরিস্থিতিতেই উদ্ভাসিত হয়েছিল। যদি এ নির্জনতা, একাকিত্ব ও হতাশার মোড় না আসত, তবে তাঁদের অস্তিত্বের খাঁটি মুক্তা এভাবে বিকশিত হতো না। তাঁরা অন্ধকারের মধ্যেই আলোকবর্তিকা হয়েছেন; হযরত যাহরা (সা.আ.)-এর ফাদাকিয়া ভাষণ, হযরত যয়নাব (সা.আ.)-এর শামের বক্তৃতা এবং হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর অবস্থান—যখন সবাই অস্বীকার করছিল, তখন তিনি রাসূল (সা.)-কে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন—এটাই এর প্রমাণ।

সুপ্রিম হাওজা কাউন্সিলের এ সদস্য আরও বলেন, আমি কখনো বলি, আশুরার পরের বিকেলে রাসূল (সা.)-এর বেলায়েত ও খিলাফতের সত্যিকারের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য মুসলিম বিশ্বের কোথাও কোনো আশা অবশিষ্ট ছিল না, কিন্তু হযরত যয়নাব কুবরা (সা.আ.) এ মহিয়সী নারীই সে আশাকে জীবন্ত রাখেন এবং পথ চলা অব্যাহত রাখেন। এটি আমাদের জন্য এক মহান শিক্ষা, যেন আমরা কঠিনতম পরিস্থিতিতেও কৌশল, প্রজ্ঞা ও সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের পতাকা উড্ডীন রাখতে পারি।

বিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন সংগ্রাম ও দৃঢ়তা
তিনি মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, গত কয়েক বছরে মুসলিম বিশ্বের ওপর শয়তানি আঘাত বর্ষিত হয়েছে—গাজা থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল পর্যন্ত। মহান ও সচেতন মানুষের কৃতিত্ব হলো, এ সংকট ও কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকা। আফগানিস্তানের আলেমগণও এ বিষয়ে সজাগ রয়েছেন এবং এ বিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন সংগ্রাম ও দৃঢ়তার বর্তমান বিশেষ প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত গুরুত্ব রয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের জন্য হাওজার অগ্রাধিকার
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উপস্থিতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, তরুণ প্রজন্মের প্রতি, তা স্কুল-কলেজে হোক বা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

ইরানের হাওজাসমূহের পরিচালক কাবুলের ফিকহি মারকাজের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে বলেন, কাবুলে এ কেন্দ্রের কাজ প্রশংসনীয়; এটি সেখানে একটি বিশেষ ও অনন্য উদ্যোগ।

শিয়া-সুন্নি সম্পর্কে আফগানিস্তান এক উৎকৃষ্ট মডেল
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, শিয়া-সুন্নি সম্পর্ক বিশেষ সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়টি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আফগানিস্তানের মতো দেশে এর প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আফগানিস্তান সবসময় শিয়া-সুন্নি সম্পর্কে এক ভালো মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল, আর এজন্যই শত্রুরা এ সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টির চেষ্টা করে।

সুপ্রিম হাওজা কাউন্সিলের সদস্য আরও জোর দিয়ে বলেন, ঐক্য রক্ষা করা মানে নিজের অবস্থান ও আকিদা-বিশ্বাস থেকে পশ্চাদপসরণ নয়। আমাদের বিশ্বাসের নিজস্ব স্থান রয়েছে, তবে তার প্রকাশ ও বাস্তবায়ন আলেমদের মতামত ও পরিস্থিতি অনুযায়ী হতে হবে। আমার মতে, এ সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুপ্রিম হাওজা কাউন্সিলের সদস্য আফগানিস্তানের উলামা পরিষদের গঠন প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমানে উলামা পরিষদ যেভাবে কাজ করছে এবং সেখানে যেভাবে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা অত্যন্ত মূল্যবান। সকলের ঐক্যবদ্ধ ও এককণ্ঠে কথা বলার চেষ্টা করা উচিত।

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি আরও বলেন, জ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণাই আমাদের প্রধান শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে, বিশেষ করে শিয়া ও অ-শিয়া তরুণদের, তাদের জ্ঞানভিত্তিক শক্তি বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে হবে। আর হাওজা ক্ষেত্রেও আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে আমাদের জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে, কারণ আমাদের প্রকৃত মূল্য ও শক্তি জ্ঞানার্জনের ওপরই নির্ভরশীল।

জ্ঞানের ভিত্তি সুদৃঢ়করণ ও তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, যদি আপনার দর্শন, কালাম ও ফিকহ শক্তিশালী থাকে, তবে আপনি যেকোনো স্থানে ও যেকোনো ব্যক্তির সাথে সংলাপ ও মতবিনিময়ের সামর্থ্য রাখবেন। আপনার বিশেষভাবে নিজের কাজে তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সংলাপ ও আলোচনার দক্ষতা অর্জন করতে পারেন; এটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

তিনি আরও বলেন, জ্ঞানার্জনের ধারাবাহিকতা মানুষের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি বৃদ্ধি করে। যখন পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, তখন মানুষ আরও বড় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়। তাই হাওজা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জ্ঞানগত, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির ভিত্তি গড়ে তোলা ও সুদৃঢ় করা বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

হাওজাসমূহের পরিচালক হাওজা শিক্ষাক্ষেত্রে আফগানিস্তানের অবস্থান প্রসঙ্গে বলেন, আফগানিস্তানে শিয়া চিন্তাধারার এক ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে এবং এর অনেক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন ও রয়েছেন। এ গৌরবময় ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হাওজাসমূহ একইসাথে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে: প্রথমত, মসজিদ, মিম্বর, মিহরাব ও জনসেবার জন্য আলেমদের প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরি—যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, মেধাবীদের সমর্থন দিতে হবে যাতে তারা জ্ঞানের উচ্চ শিখরে আরোহণ করতে পারে।

আফগান সমাজে ধর্মীয় ও ইসলামী ঐকান্তিকতা অত্যন্ত বলিষ্ঠ
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি হাওজা শিক্ষাব্যবস্থার দু’টি মুখ্য লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের একইসাথে দু’টি পথ অনুসরণ করতে হবে: সমাজের সাধারণ দায়িত্ব পালনের জন্য জনশক্তি গড়ে তোলা এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদা লাভ ও বিশ্বব্যাপী ভূমিকা পালনে সক্ষম মেধাবীদের প্রস্তুত করা।

হাওজাসমূহের পরিচালক জোর দিয়ে বলেন, আফগান সমাজে ধর্মীয় ও ইসলামী ঐকান্তিকতা অত্যন্ত বলিষ্ঠ। এই বিশাল সমাজের সেবা করাই আপনার দায়িত্ব। শিয়াদের পাশাপাশি সুন্নিদের সাথেও সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha